প্রতি বছর বাংলা একাডেমীতে সব হয় (বই মেলা, গান) তবে বাংলা ভাষার কোন উন্নতি হয় না বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমীর সেমিনার কক্ষে ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ভাষা আন্দোলনে প্রকৃত ইতিহাস এখনও রচিত হয়নি দাবী করে বিশিষ্ট সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখা হয়েছে। যা অপূর্ণাঙ্গ।
পূর্ণাঙ্গ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখার জন্য বাংলা একাডেমীকে উদ্যোগ নেওয়ার আহবান জানিয়ে গাফফার চৌধুরী বলেন, বিশিষ্ট ভাষা, গবেষক ও ভাষা সৈনিকদের নিয়ে একটি কমিটি করে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলেই তা করা সম্ভব হবে।
বাংলা ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে না ব্যবহার করে প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভাষা সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে বাংলা ভাষা আজ হুমকির মূখে জানিয়ে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ইংরেজী, ফ্রেন্স, জার্মান ও হিন্দির ভাষার চাপে বাংলা আজ হুমকির মূখে।
ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে অভিযোগ করে প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন তখন বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষার দাবি জানিয়েছিলেন।
ওই সময় আজিজ নামের আরেক বাঙ্গালি উর্দ্দু ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
গাফফার চৌধুরী উল্লেখ করেন, পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা যদি নাও করা হয় তবে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্তি দাবি জানিয়েছিলেন।
স্বাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গে যেমন বিতর্কিত করা হয়েছে তেমনিভাবে ভাষা আন্দোলন নিয়েও বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা বলে তিনি জানান।
যার যতটুকু প্রাপ্তি তা দিতে অসুবিধা কোথায় বলে মন্তব্য করে এই সাংবাদিক বলেন,বঙ্গবন্ধুকে ফুলিয়ে ফাঁফিয়ে নয় তার যতটুকু অবদান তা লিখতে অসুবিধা কোথায়।অন্য কোনো ব্যক্তির যতটুকু অবদান তা তাকে দেওয়া উচিৎ।এ নিয়ে বিতর্ক করা খুব খারাপ।
বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র হিসিবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রথম পর্যায়ে তমুজদ্দিন মজলিশ ভূমিকা রাখলেও পরবর্তিতে তারা পাকিস্তানী সরকারের সাথে আতাত করেছিল বলে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও বামপন্থী নেতা বদরুদ্দীন ওমর এর কঠোর সমালোচনা করে এই সাংবাদিক বলেন, ভাষা আন্দোলনে বদরুদ্দিন ওমরদের কোন ভূমিকা ছিল না। তখন বদরুদ্দিন ওমররা ইসলামি জবান নামে ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠনও করেছিল। ইসলামি জবানের সদস্যরা হলেন-বদরুদ্দিন ওমর , ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমদ।
বাংলা ভাষার গ্রহন ক্ষমতা অন্য ভাষার চেয়ে অনেক বেশি বলে মন্তব্য করে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী জানান, বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির প্রভাবে প্রতিনিয়তই বাংলা ভাষায় নতুন নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে। যেমন-ইন্টারনেট, টেলিভিশন, ক্যামেরা প্রভৃতি।
কয়েকজন ছাত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি বলে মন্তব্য করে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ভাষা আন্দোলনে সাধারণ জনতা ও ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গিয়েছিল। কয়েকজন ছাত্রের মৃত্যুর পর সারাদেশে এটা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়ে যায়।
পরবর্তিতে ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পর পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্য মন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাকে যে অভিযোগে বহিস্কার করা হয় তার মধ্যে এটিও ছিল অন্যতম কারণ।
এভাবেই বাংলা ভাষা পরবর্তীতে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মর্যাদা পায়।
আলোচনায় অংশ নেন জনাব সাঈদ হায়দার, অধ্যাপক আহমদ কবির, প্রাবন্ধিক ডা. আহমদ রফিক এবং অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গণসংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী অজিত রায়, বিপুল ভট্টাচার্য, রূপা ফরহাদ, রেবেকা সুলতানা, বুলবুল মহলানবীশ, মাহমুদ সেলিম এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মুক্তধারা’।
যন্ত্রাণুসঙ্গে ছিলেন শিল্পী রবীন্দ্রনাথ পাল, গৌতম মজুমদার, মোঃ ফারুক, গাজী আবদুল হাকিম ও ইফতেখার হোসেন সোহেল।
রেডটাইমস বিডি ডটকম/ওও/আর এস