ড্যাপ নিয়ে বিতর্ক কেন?
|
|
ঢাকা, ২৬ জুন, রেডটাইমস বিডি ডটকম: ঢাকার ড্যাপ নিয়ে বেশ বিতর্ক হচ্ছে।ঢাকা মেট্টোপলিটন ডেভেলাপমেন্ট প্ল্যান এর তিনটি অংশের একটি হলো ড্যাপ। ড্যাপ হলো ষ্ট্রাকচার প্লান (বৃহত্তর ঢাকার কোথায় কি হবে তার কর্মসূচী) বিস্তারিত করা। ১৯৯৫ সালে ডিএমডিপি হওয়ার পরই বিভিন্ন এরয়িার ড্যাপ পর্যায়ক্রমে হওয়ার কথা। সেই ড্যাপ জনগণের মতামত নিয়ে ২০০৭ সালে চূড়ান্ত হয়। কিন্তু কিছু পরিবেশবাদী ও ডেভেলপারের বিতর্কে ড্যাপ এর একটি রিভিউ কমিটি হয়। ডিএমডিপি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ডিএমডিপি‘তেই আছে। সেখানে ড্যাপ এর কোন রিভিউ বা পর্যালোচনার বিধান নাই। রিভিউ হয় প্রতি ৫ বছর পর পর ষ্ট্রাকচার প্লানের। ১৯৯৭ সালে ডিএমডিপি গেজেট আকারে প্রকাশের পর তা আর হয়নি। সেই ১৯৯৫ সালের ষ্ট্রাকচার প্লানের উপর এখন ড্যাপ ঘোষণা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৯৯৫ সালের নগর পরিস্থিতি আর সেখানে নেই। তাই এখনকার ড্যাপ নিয়ে কিছু আইনগত বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। জনমনে একটা ধারনা হয়েছে, ড্যাপ হলেই বুঝি ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা আর হবে না। এরকম সরল ধারনা থেকে পরিবেশবাদীরা বাহবা পেয়েছে বটে। ড্যাপ এর এখন প্রাধান্য পেয়েছে বেড়ী বাঁধের বাইরের জমি কিভাবে রাখা হচ্ছে তা নিয়ে। এর সাথে ঢাকার বর্তমান নগর এলাকার জলাবদ্ধতার সম্পর্ক কম।
মূল ঢাকার জলাবদ্ধতা (বেড়ী বাঁধের মধ্যের অংশ মিলে) নির্ভর করে অনেকটাই এই অংশের রিটেনশান পন্ড বা লেক থাকা ও পাম্পিং ষ্টেশনের কার্যকারিতার উপর। সেজন্য বিষয়টির গভীরে কি আছে তা দেখা দরকার।
ঢাকা শহরের বয়স নাকি ৪০০ বছর। ১৬০৮ সালে মোগল সুলতান ঢাকা আগমনের সময়কে ঢাকার গোড়াপত্তন বলাটা ঠিক নয়। বৌদ্ধদের শাসনের ইতিহাসে দেখা যায় ৭ম শতাব্দিতে ঢাকার অস্তিত্ব ছিল। দ্বাদশ শতাব্দিতে রাজা বল্লাল সেনের সময় ঢাকায় ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মোগলদের সময় থেকেই এই শহর একটি অঞ্চলের শাসন কেন্দ্র হিসেবে ইতিহাসে গুরুত্বের স্থান নিতে থাকে। ঢাকা নগরী তথা পৌর সুবিধা হিসেবে বেশি দিনের নয়। ১৮৭৪ সালে মাত্র ঢাকাতে পানি সরবরাহ পদ্ধতি চালু হয়। ১৮৬৪ সালে যখন ঢাকা পৌরসভা গঠিত হয় তখনকার বৃটিশ জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট গ্রাহামের লেখা থেকে দেখা যায় পল্টনের বৃটিশ সামরিক ক্যাম্পকে সরিয়ে আনতে হয়েছিল সৈনিকরা পল্টনের জঙ্গলের কাছের বড় বড় মশার কামড়ে অসুস্থ্য হচ্ছিল বলে। তখন বৃটিশদের সাথে সিলেট অঞ্চলের এক যুদ্ধে মণিপুরীরা ধৃত হলে তাদেরকে ঢাকার অদূরের একটি গ্রামে রাখা হয়, যা এখন মণিপুরীপাড়া। তখনই বাকল্যান্ড বাঁধ তৈরী হয় ঢাকাকে বুড়িগঙ্গা নদীর বন্যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। মাত্র ৪১ বছর পর ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধের পর ঢাকা শহর একটি স্রেফ জেলা শহরে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের পরে যারা কোলকাতা থেকে ফিরে আসে তাদের মধ্যে অভিজাত শ্রেণীর খেদ ছিল। তারা এখানে ভাল কোন কসমেটিক নাকি ক্রয় করতে পাননি। তখন দুই লাখের কম লোকের ঢাকা শহর। তাতেও তেজ ছিল সমাজ জীবনে।
এই মহানগরী এখন থেকে ৩০ বছর বা ৫০ বছর বা ১০০ বছর পর কি হবে সেটা ভাবতে হবে। আমরা এখন ৩৬০ বর্গকিলোমিটারের ঢাকা নগর দেখছি যখন দিল্লীর নগর এরিয়া ১৪৮৪ বর্গকিলোমিটার। কেউ বিমানে দিল্লী গেলে উপর থেকে দেখতে পাবেন কি বিশাল দিল্লী গড়ে উঠেছে ছোপ ছোপ করা গুচ্ছ শহরের সমন্বয়ে।
সেখানকার আবহাওয়া চরম ভাবাপন্ন হলেও এর বিশালত্বকেই মানুষ ভালবেসে সেখানে বসতি গড়ে। সেখানের মূল শহর এলাকার বাসিন্দা এখন ১ কোটি ২৬ লাখ, আর পুরো মেট্রো এলাকায় থাকে ১ কোটি ৮৯ লাখ লোক। সেরকম একটি ঢাকার কথাই ভাবতে হবে। দুনিয়ার সবচাইতে বেশি রেটে রাড়ছে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা।
স্বাধীনতার পর ঢাকার সকল পরিকল্পনা ও ধারনা বদলে যায় মানুষের ঢাকামুখী আগমনে। লোকের আগমনের চাপে নীতি নির্ধারকদের ভাবতে বাধ্য হয় যে, একটি আধুনিক ঢাকার পরিকল্পনা করতে হবে। ভাবতে ভাবতে ১০ লাখে লোকের অবকাঠামোর ঢাকায় উঠে আসে ৮০ লাখ লোক। এক বিশাল মহানগরীর রূপ নেয় ঢাকা।
শুরু হয় নগর জীবনের নানা সমস্যা। খাবার ও ধোয়ামোছার পানির অপর্যাপ্ত, রাস্তার ম্যানহোলে উপচে উঠছে বর্জ, বর্ষায় জল জমে যাচ্ছে রাস্তাঘাটে, বন্যায় অধিকাংশ এলাকা ডুবে যাচ্ছে, বিদ্যুতের অসহনীয় লোড শেডিং, যানজট বেড়ে যাচ্ছে সহ্যের বাইরে।
একটি সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণী কলেবরে বড় হয়ে উঠে। তারাই মূলত সকলের সাথে এক হয়ে পরিবেশ বিষয়টি নিয়ে ঢাকার যথার্থ উন্নয়নের দাবী নিয়ে মাঠে নামে। এর মধ্যে পূঁজিতান্ত্রিক সমাজের অতি সুবিধাবাদীদের একাংশের কাছে বড় হয় ন্যাচারাল পরিবেশের বিষয়টি।
এত লোকের আগমনের বিষয়টি তারা সহ্য করতে পারে না। তারা দরিদ্র মানুষকে নগরীর আবর্জনার মতই ছুড়ে ফেলতে চায়। কিন্তু নদী ভাঙন থেকে, হাওরের বিধ্যস্ত জনপদ থেকে, ঘুর্ণিঝড়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া থেকে আগমনরত মানুষের ঢল বন্ধ হবে কিভাবে? ঢাকা হয়ে যায় সারাদেশের একটি মাত্র বড় অর্থনীতির কর্মকান্ডের কেন্দ্র, সেখানে যে-ই আসে যৎ সামান্য হলেও কর্মসংস্থান হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে অনেকটা।
একইসাথে একটি আধুনিক শহর যা নতুন প্রজন্মকে হাত ছানি দেয় বিশ্ব মানুষের আধুনিক জীবনের সাথে মিশে যেতে। কিন্তু নগরীর নানা সমস্যাগুলো কেবল তীব্রতর নয়, নানা দূর্ঘটনারও জন্ম দিতে থাকে। মধ্যবিত্তদের মাঝে অর্থের কমতি থাকলেও মানসিকতায় সুবিধার বিঘœ ঘটার যন্ত্রণা বাড়তে থাকে।
ডিএম ডিপি বাস্তবায়ন করার পর্যায় ৩টি। (১) ষ্ট্রাকচার পরিকল্পনা(২) আরবান এরিয়া প্ল্যান এবং (৩) ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান ১৯৯৫ সালের ঢাকা শহরটি ২০০ বর্গকিলেমিটারের মত। তার পরিধি করা হয় ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার বা ৫৯০ বর্গমাইলের।
২০১০ সালের শেষে তা ১ কোটি ৫০ লাখ হওয়ার কথা। ঢাকা আয়তনে অনেক বেড়ে গেছে। ঢাকার মধ্যেকার ৪৬টি খাল ভরাট হয়েছে বা কোনটা বক্স কালভার্ট হয়েছে বা নানাভাবে হারিয়ে গেছে। অথচ এই শহরের পানি সাময়িক জমা হতে হয় বিভিন্ন জলাশয়ে তথা লেকে বা রিটেনশন পন্ডে।
বসুন্ধরা প্রকল্পে যারা ১৬ বছর আগে একটি প্লট কিনেছিল ১৬ লাখ টাকায় এখন তার মূল্য ৪ কোটি টাকারও বেশি। তাই এই মহানগরীতে পরিকল্পিত জমি পাওয়ার প্রতিযোগিতা বিশাল এবং এটাই নির্দিষ্ট করে এখানে আবাসিক জমি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম আছে। সে জমি রাখতে নির্দিষ্ট পরিমান উন্মুক্ত স্থানও রাখতে হয়।
সরকারই অনেক উন্মুক্ত স্থান নষ্ট করে মার্কেট তৈরী করেছে। খাল সবচাইতে বেশি ভরাট করেছে সরকার। ভবন নির্মাণের জন্য একটি নীতিমালা তৎকালীন ডিআইটির ছিল।
পরে ১৯৯৪ সালে তা আরো বিস্তারিত করা হয়। কিন্তু তা কেবল কাগজে থেকে যায়, বাস্তবায়ন হয় নির্মাতার ইচ্ছা মাফিক। তাতে প্রতিটা ভবনই অনুমোদিত নকশাঁ অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। ভবনের পাশে কোন জমি কেউ ছাড়তে চায়নি। যতটা বৃষ্টির পানি মাটিতে শুষে নেয় সে জায়গা থাকেনি।
তাতে ঢাকার অপরিকল্পিত এলাকায় একটি ঘিঞ্জি শহরে পরিণত হয়। সরকার কিছু আবাসিক এলাকা তৈরী করে ধানমন্ডি, গুলশান, বণানী, বারিধারা ও উত্তরা।
পরিকল্পিত এসব এরিয়ায় অভিজাত শ্রেণীর ঠিকানা হয়। মিরপুর হাউজিং এন্ড সেটেলমেন্টের পরিকল্পিত এরিয়া মধ্যবিত্তের বসবাসের জায়গা হয় এর প্লট সাইজ ছোটবড় করার কারণে। আর বাকী এলাকায় অনেক ক্ষেত্রে গাড়ী প্রবেশের রাস্তাও সংকীর্ণভাবে রাখা হয়। পুরাণ ঢাকা অঞ্চলে এক সময় ঘোড়ার গাড়ী চলতো। সেভাবেই সরু ছিল রাস্তা। স্বাভাবিক কারণেই পুরান ঢাকা পরিবেশের দিক থেকে অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ে।
সেখান থেকে ধনী লোকরা অধিকাংশ সরে আসে। সেই এলাকায় এখন যন্ত্রপাতি তৈরী ও বিক্রির কাজ হয় এবং স্বল্প বিত্তের লোকরা ও দোকান/ফ্যাক্টরী কর্মচারীরা থাকে। কোন অগ্নি দূর্ঘটনা হলে সেখানে আগুন নেভানোর গাড়ী প্রবেশ করতে পারে না। ডিএমডিপিতেই বলা হয়েছে, ১৯৮৭ ও ৮৯ সালের বন্যায় ঢাকার খুব সামান্য এলাকাই বন্যামুক্ত ছিল। তাই ঢাকাকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে তৈরী করা হয় তুরাগ নদীর পাড় ঘেষে ভেরী বাঁধ। ঢাকার বৃষ্টির পানি এই বাঁধের মধ্যে আটকে যায়।
প্রায় সব সময়ই বাঁধের বাইরের পানির উচ্চতা বেশি থাকে। ঢাকার বর্তমান আরবান এরিয়ার চারপাশে হাজারো ফ্লাড ফ্লো জোন রাখলেও যেহেতু ঢাকা সমতল ভূমির উপর অবস্থিত, তাই বৃষ্টির পানি সরাতে পাম্পিং ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হবে। হচ্ছেও তা-ই। আগে বৃষ্টির পানির পতিত পয়েন্ট ছিল ১ বা ২ মাইল দূরে, এখন তা হয়তো ৭ বা ৮ মাইল দূরে। পানি সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতেই শহরের মধ্যে জমে যায় এবং উচ্চতা বেড়ে যায়।
যে কয়েকটি প্রধান পাম্পিং ষ্টেশন বেড়ী বাঁধের সাথে রাখা হয়েছে তা পানি সরাতে যথেষ্ট নয়। এসব পাম্পের কাছাকাছি অবস্থানে পানি এসে থামতে বড় আকারের লেক বা রিটেনশান পন্ড রাখতে হয়। এখনো তা
অপরিকল্পিভাবে আছে। তবে সরকার সেসব পন্ড পরিপাটি করে তৈরী না করলে তা থাকবে না। সেসব পন্ড এখনো ব্যক্তি মালিকানার জমির উপর আছে। তা হতে হবে সরকারী জমির উপর।
বাঁধের বাইরে ও ভিতরে অনেক ল্যান্ড প্রকল্প হয়েছে অনেক আগে থেকেই। ২০০৪ সালের ভূমি উন্নয়ন নীতিমালা হওয়ার পর অধিকাংশ ল্যান্ড প্রজেক্ট অনুমোদন লাভ করেনি। অথচ ঢাকাতে দৈনিক গড়ে ২০০০ লোক নতুনভাবে প্রবেশ করছে যারা বসতি স্থাপন করছে। সেভাবে ঢাকার নগরায়ন হচ্ছে না। ব্যক্তিমালিকরা যা করছে তা ঘিঞ্জি এক ঢাকার জন্ম দিচ্ছে। যতটা ভাল হচ্ছে ল্যান্ড প্রজেক্টগুলোর দ্বারাই।
সেসব আসলে বন্ধ করে বা অচল করে রাখার জন্য সরকার ও সর্ব মহল থেকে যেন চেষ্টা হচ্ছে বলা যায়। তাহলে পরিকল্পিত ঢাকা কিভাবে তৈরী হবে? এতদিন যেভাবে চলছিল সেভাবে? এরকম বাঁধা সৃষ্টির আরেকটি কারণও আছে। সেটা অনেকেই আন্দাজ করতে পারবেন। ল্যান্ড প্রজেক্টগুলোর কোম্পানীগুলোকে যত বেশি চাপে রাখা যাবে এক শ্রেণীর তত বেশি আর্থিক লাভ হবে।
শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে পড়ছে জনগণের উপর। ঢাকাতে পরিকল্পিত এলাকা কমে যাওয়ায় মূল নগর এলাকায় জমির দাম আকাশচুম্বি হচ্ছে এবং তার জন্য ফ্ল্যাটের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। অবশ্য ল্যান্ড ডেভেলপাররা সঠিক আইনের প্রয়োগের অভাবে অনেকে ভূমি ডাকাতে পরিণত হয়েছে। পুরো সমাজে যেহেতু আইন অমান্যের অভ্যস্ততা বেশি, তাই এদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। (প্রথম কিস্তি) রেডটাইমস বিডি ডটকম/ ই এইচ/ এস ডি/ এস আমিন
WARNING: Any unauthorised use or reproduction of redtimesbd.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. |
| |
| |
| |
|
|
|
| |
| Related News |
| No more Related News Found |
|
|
| |
|
|
|
|
| |
| |
|
|
|