শিল্প সাহিত্যের পরিব্রাজক
|
|
প্রিয়তোষ গুপ্ত শিল্প ও চিত্রকলার প্রতি সন্তোষ গুপ্তের ছিল প্রবল আকর্ষণ। এদেশের প্রথম সারির প্রায় সব শিল্পীর শিল্পকর্মের উপর তাঁর রয়েছে বিদগ্ধ আলোচনা সমালোচনা । শিল্পের প্রতি তিনি ছিলেন বিশেষভাবে অনুরক্ত।
আসলে মানুষের জীবনে শিল্প কোনে বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন। সন্তোষ গুপ্তের শিল্প ভাবনা চিত্রসমালোচনা, নাট্য সমালোচনা বিষয়ক লেখা এদেশে বহুকাল শিল্পীদের পথ দেখাবে। শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনে তাঁর বিচরন ঈষনীয়ভাবে প্রতিফলিত হতো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যতীত শিল্প সাহিত্যের জটিল শাখা গুলোতে অবাধ বিচরণ এর দৃষ্টান্ত তিনি নিজেই ।
সমাজ পরিবর্তন ও শোষন মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতির যাত্রা শুরু । জেল, জুলুম, অর্থকষ্ট, জীবন সংগ্রাম সবই ছিল যার নিত্য সহচর। ঐশরিক মেধা তো ছিল ছোটবেলা থেকেই। জেলে বসেই সৃষ্টির শুরু ।
কবিতা, অনুবাদ। তারপর সাংবাদিকতা । পাশাপাশি শিল্পের গৃঢ় রহস্য উদ্ঘাটন। চিত্রকলার মূর্ত বিমূর্ত বিশ্লেষন, শিল্পীর সমস্যা, দর্শকের মন, শৈল্পিক সৌন্দর্যের উৎস, সাহিত্য ও চিত্রকলার পারস্পরিক সম্পর্ক সহ অসংখ্য বিশ্লেষন চলেছে একচ্ছত্রভাবে। সংবাদপত্রের নিয়মমাফিক কাজের পাশাপাশি অনুবাদ প্রবন্ধ, গদ্য, পদ্য সবই চলছিল।
এরপর এলো ছদ্মনামে অনিরুদ্ধের কলাম, যা এদেশের রাজনীতি ও সমাজনীতিতে ছিল দিক্ নির্দেশনার প্রতিচ্ছবি। একই সাথে দেশের বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্র পত্রিকায় চলছিল বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি।
অনিরুদ্ধ ছদ্মনাম ছাড়াও সিদ্ধার্থ ও পান্থ নামে লিখতেন দৈনিক বাংলার বাণী ও দৈনিক খবর পত্রিকায় । সাপ্তাহিকে ধারাবাহিক লিখতেন বেলা অবেলার গান, সন্তোষ গুপ্তের জার্নাল, সন্তোষ গুপ্তের ডায়েরি সহ বিভিন্ন কলাম। শিল্প সম্পর্কে সন্তোষ গুপ্তের একটি বিশ্লেষন এই রকম ঃ
”শিল্পের মূল কথাটা হল মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্কের বিকাশ ও নিরন্তর পরিবর্তন। মানুষের আবির্ভাবের উষাকাল থেকে এই সম্পকের্র বিকাশই শিল্পের যুগ থেকে যুগান্তরে উত্তরণের কাহিনী। মানুষের প্রকৃতি সৎলগ্নতা ও প্রকৃতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার তথা প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করে স্বীয় অস্থিত্ব রক্ষা ও ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি এক পর্যায়ে এসে জটিলতর হয়েছে। সমাজ ও সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে।
মানুষের সৌন্দযবোধও প্রকৃতির সঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতা থেকে সৃষ্টি। সুতরাং শিল্প ও সংস্কৃতি সমাজ বিকাশের চেতনাগত ধারনা ও সৃষ্টির বহিঃপ্রকাশ।... সাহিত্য ও শিল্পের মধ্য দিয়ে মানুষ তার যুগ সঞ্চিত অভিজ্ঞতাকে সমকালীন জীবনের সঙ্গে সমন্বয় এবং উত্তরণের দিকে চালিত করেছে। সেখানে মানুষের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, রুচি এবং জীবনদর্শন একই সূত্রে গ্রথিত।”
শিল্প সাহিত্যের সকল শাখায় অনুপ্রবেশ তাঁর কাছে সহজাত ছিল। তাঁকে ইতিহাসবেত্তাও বলা চলে। ইতিহাসের বহু ঘটনার সাথে সমকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিকে বিশ্লেষন করতেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে।
সন্তোষ গুপ্তকে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন করার ক্ষেত্রে তাঁর শৈশবকালে শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল প্রবল। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ই শিক্ষক দেবকুমার চক্রবর্তীর কাছে এক প্রকার রাজনীতির হাতেখড়ি হয় তাঁর। দেবকুমার ঐ সময়ই কৎগ্রেস, কমিউনিষ্ট পার্টি, রেডিক্যাল পার্টি ইত্যাদি নামের সাথে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। অনুশীলন দলের শিক্ষক সুরেশ্বর চক্রবর্তীর ও ভূমিকা ছিল অনেকখানি। ১৯৪৪ সালে পিসি যোশী ও কল্পনা যোশীর অনুপ্রেরণার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন সন্তোষ গুপ্ত।
সন্তোষ গুপ্তের মৌলিক ও অনুবাদ কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আমাদের দেশের প্রধান কবি প্রয়াত শামসুর রাহমান লিখেছিলেন ”সম্প্রতি সন্তোষ গুপ্তের কবিতার বই অসমাপ্ত কবিতা হাতে আসার পর রহস্য উন্মোচিত হলো। তিনি সন্দেহাতীত ভাবে একজন কবি। সুকবি।
এতদিন তাঁর এই পরিচয় আমার কাছে অনুদ্ঘাটিত ছিল ভেবে লজ্জিত হলাম।” সন্তোষ গুপ্তের অনুবাদ থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করছিঃ সকালে যখন তোমার ছায়া পিছু পিছু ফেরে, কিংবা সন্ধ্যায় সেই ছায়া উঠে সম্মুখে দাঁড়ায় তা থেকে আলাদা কিছু দেখাবো তোমাকে; দেখাবো কেমনে মুষ্টিমেয় ধূলিতলে শঙ্কা থাকে জেগে। [লাশ দাফন- মূল: এলিয়ট]
”মাধবী দিনের সাথে করিব কি তুলনা তোমার? তুমি আরো মনোরমা কান্তিময়ী সুøিগ্ধ উজ্জল দুরন্ত হাওয়ায় কাঁপে বসন্তের নব পুষ্পভার, আর দেখ মধুমাস ক্ষনস্থায়ী একান্ত চঞ্চল” {শেক্সপিয়র সনেট-১৮}
সন্তোষ গুপ্তের বহুমাত্রিক লেখার ক্ষমতা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তাঁকে সব্যসাচী লেখক হিসেবে পরিচিত করেছে।
রবীন্দ্রনাথ থেকে বঙ্গবন্ধু, পিকাসো থেকে জয়নুল, অমিয় চক্রবর্তী থেকে শামসুর রাহমান, সমাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র সবকিছুই ছিল তাঁর লেখার বিষয়বস্তু।
পুস্তক সমালোচনার ও যে একটি সাহিত্য মূল্য থাকতে পারে, তা সন্তোষ গুপ্তের অজস্র পুস্তক সমালোচনা থেকে তা অনুধাবন করা যায়। তাঁর কোন কোন সমালোচনা এক একটি প্রবন্ধের আকার ধারন করত।
বাংলাদেশে সংস্কৃতি অঙ্গণের প্রতিটি অধ্যায়- নাটক, নৃত্যকলা, সঙ্গীত, মুকাভিনয়সহ সকল বিষয়ে তাঁর কলম সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গণকে করেছে সমৃদ্ধ। বহুমাত্রিক এই লেখকের সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন, জাগতিক সুখ বিত্ত-বৈভরের প্রতি নিলিপ্ততা তাঁেক ঋষ্তিুুল্য পন্ডিতে পরিনত করেছে। মাস্টারমশাই সন্তোষ গুপ্ত মূলত চেতনার যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন সন্তোষ গুপ্ত এবং তাঁর মতো আরো অনেকে, তাঁদের সে সময় আর সংগ্রামের একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্রের উপস্থাপন অনুভব করা যাবে তাঁকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র মাস্টারমশাই-এ । যুগ যুগ ধরে আমাদের স্বাধীকার আন্দোলন ও জাতিসত্ত্বার যে দীর্ঘ সংগ্রাম তার একেকটি পট এখানে উন্মোচিত হয়েছে।
সন্তোষ গুপ্ত শুধু এই সমাজের একজন সংবাদকর্মীই ছিলেন না, বরং নিজের কর্ম আর চেতনা সম্মিলন দিয়ে হয়ে উঠেছেলেন সংবাদের সমাজকর্মী। জীবন চেতনার কোন অংশ যদি ব্যক্তিমানুষের গন্ডি ছাড়িয়ে স্পর্শ করতে পারে যুগ, কাল কিংবা সমকালীন সময়ের ঐতিহাসিক সত্যকে, তখন ব্যক্তি ও হয়ে উঠতে পারে সমাজের প্রতিবিম্ব। মাস্টারমশাই সন্তোষ গুপ্ত তাই সেই কালেরই প্রতিবিম্ব।
শৈশব থেকে জীবন সংগ্রামী এক মানুষ কিভাবে আমৃত্যু সেই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারে তাঁর দৃষ্টান্ত সন্তোষ গুপ্ত নিজেই, যাঁর সামনে অজস্র সুযোগ ছিল অর্থ সম্পদের মালিক হবার, আরাম আয়েসে জীবন যাপন করার, কিন্তু তাঁর প্রোলিতারিয়েত জীবনযাপন তাঁকে একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে পরিচিত করেছে, যিনি তাঁর অসাধারণ সৃষ্টির জন্য বেঁচে থাকবেন বহু কাল। রেডটাইমস বিডি ডটকম/প্রতিনিধি/ওও/এসডি
WARNING: Any unauthorised use or reproduction of redtimesbd.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. |
| |
| |
| |
|
|
|
| |
| Related News |
| No more Related News Found |
|
|
| |
|
|
|
|
| |
| |
|
|
|