ঢাকা,ডিসেম্বর ৩১,রেডটাইমস বিডি ডটকম
ভারতীয় সংগীত জগতে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন বাঙালি সন্তান কুমার শানু। দীর্ঘ কুড়ি বছর সঙ্গীত জগতে রাজত্ব তার। এই দীর্ঘ সময়ের নানান ঘটনা রটনা নিয়ে শিল্পী কুমার শানুর সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো-
‘আশিকি’ মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৮৯-এ। তখন থেকে ডিসেম্বর ২০০৯। কুড়ি বছর ধরে আপনি গায়ক। কিন্তু আজকাল আপনাকে দেখাই যায় না। কুমার শানু গেলেন কোথায়?
আছে, আছে, কুমার শানু এখনও আছে। কুড়ি বছর আগেম ‘আশিকি’ রিলিজ করার সময়ে যা ব্যস্ত ছিলাম, তার চেয়ে ঢের ব্যস্ত এখন আমি। এখন তো আর কেবল গান গাই না।
মুম্বাইতে আমার এখন দু’খানা স্টুডিও। প্রোডাকশন হাউজ আছে। বিজনেস দেখতে হয়। ‘শো’ করি। বিরাট ব্যস্ততা আমার।
এত ব্যস্ত আপনি কিন্তু আপনার নতুন গান-টান তো শোনা যায় না। সেটা কেন?
আমি যে ধরনের গানের জন্য বিখ্যাত, সে ধরনের গান তো আজকাল হয় না। পাবলিকের টেস্ট চেঞ্জ হয়েছে। আজকাল পাঞ্জাবি পপ আর ওয়েস্টান সুরের গান ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। তো মানুষও ওই ধরনের গানই শুনছেন। কিন্তু এ নতুন কিছু নয়।
গায়কদের এমনই হয়। ১৯৭১ এর পর মহম্মদ রফির তো কাজই ছিলো না। ’৮১ পর্যন্ত চলে এই অবস্থা। রফি সাহেবের তো হার্ট এ্যাটাকও হয়ে গিয়েছিল ওই সময়টাতো।
১৯৭১ -এর আগে কিশোর কুমারের হাতেই বা কী কাজ ছিলো? এই এখানে ওখানে ছুটকো-ছাটকা এক আধটা গান গাইতেন। সব গায়ককেই এই অবস্থায় পড়তে হয়।
কিন্তু আপনি তো আজকাল মুম্বাইতেই থাকেন না। লোকে বলে, আপনি নাকি বেশির ভাগ সময় দুবাইতেই কাটান। ওখানেই সেটল করবেন...
আরে ধূর, এসব একেবারে মিথ্যে কথা। আমি তো মুম্বাইতেই থাকি....বাড়ি আছে ওখানে। অন্য কোথাও থাকব কোন দুঃখে? এগুলো হচ্ছে আমার ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মীদের মিথ্যে প্রচার।
এইসব বলে আমার কাজগুলো হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে ওরা। তবে, হ্যাঁ, এটা সত্যি যে দুবাইতে আমার কিছু প্রপার্টি আছে। কিছু ইনভেস্টমেন্টও করেছি। ওখানে ব্যবসা আছে আমার। তার জন্য স্বাভাবিকভাবেই খানিকটা সময় তো দুবাইতে কাটাতেই হয়। মাসে অন্তত একবার তো যাই-ই।
দুবাইতে কীসের ব্যবসা করছেন?
ফিল্ম, নানা রকম শো ইত্যাদির ব্যবসা। আমার ওখানে একটা হোটেল করার ইচ্ছেও আছে। কুমার শানু এ্যাকাডেমি নামে একটা সংস্থা তৈরির কথাও চলছে।
এসব হয়ে গেলে তখন তো ওখানে আমায় অনেকটা সময় কাটাতেই হবে। তাই বলছি, ‘বন্ধু’রা যদি দুবাই চলে গেছি বলে ভুলভাল রটায়, তা হলে সেটা খুব দুঃখের। কিন্তু এ সবে আমি অভ্যন্ত। মুম্বাইতে এভাবে গুজব রটানোটা জালভাত।
সমালোচকরা বলেন, কিশোর কুমারের মৃত্যুর পর যে ফাঁকা জায়গাটা তৈরি হয়েছিল, সে সময়ে মুম্বাই পৌঁছেছিলেন বলেই আপনি কুমার শানু হতে পেরেছিলেন। স্রেফ ভাগ্য......
দাঁড়ন, দাঁড়ান। আমি যখন মুম্বাইতে পৌঁছই, তখন ছ’জন গাইছে। প্রথম ছিলো অভিজিৎ, তার পর কিশোরদার ছেলে অমিত। তারপর বিনোদ রাঠৌড়, চার নম্বরে সুরেশ ভোঁসলে, পাঁচে ইউসুফ আর ছ’নম্বরে উদিত।
এরা সবাই তখন কিশোরের গান গাইত। এদের সকলকে টপকে আমি প্রথম হই। ভাই, কাম বোরতা হ্যায়। বাকিদের থেকে নিশ্চয় কিছু ভালো ছিলো আমার মধ্যে, নইলে একদম ওপরে পৌঁছলাম কী করে? তারপরেও যদি সমালোচকরা বলেন, ‘ভাগ্যের জোর’, আমি শুধু তাদের সৌভাগ্য কামনা করব।
একটা কথা বরাবর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় আপনাকে। ‘তুঝে দেখা তো ইয়ে জানা সনম’-এর মতো বিরাট হিট গান গাইবার পরও যশরাজ ফিল্মস ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র পর আর আপনাকে দিয়ে গাওয়াল না কেন?
সে অনেক লম্বা গল্প। আরেক দিন বলব।
এখন নয় কেন?
না, আমি একটা বই লিখছি। সেখানে সব বলব।
এই গল্পটা না হয় এখানেই বললেন। লোকে জানুক না।
ঠিক আছে, এত করে বলছেন যখন, বলেই দিই। যশ চোপড়া যে টাকায় আমাকে দিয়ে গান গাওয়াতে চেয়েছিলেন, তাতে রাজি হইনি।
‘তুঝে দেখা’র রেকর্ডিংয়ের দিনই আমি মুখের ওপর বলে দিই, আপনি যে টাকা দিচ্ছেন, সেটা আমার মার্কেট রেটের চেয়ে অনেক কম। আমি কিন্তু মোটেও খুশি নই। তাই শুরে উনি রেগে লাল।
আমার সামনেই পুরনো চেকটা ছিঁড়ে ফেলে নতুন চেক লিখে দিলেন। তার অঙ্গটা আমার চালু মার্কেট রেট অনুযায়ীই ছিল। লতাজি আর আশাজিকে কী করেন উনি? শাল দিয়ে গান গাইয়ে নেন।
আমার ক্ষেত্রেও ভেবেছিলেন সামান্য কিছু দিয়ে গান গাইয়ে নেবেন। কম রেটে গাইতে রাজি হইনি। যশ চোপড়া আমায় তাই ছেঁটে দিলেন। এগুলো সব লিখব আমার বইয়ে। এখন পিছনে তাকালে মনে হয় বরাবরই বোধহয় একটা লবি ছিল, যেটা আমার বিরুদ্ধে করত।
টানা ছ’বছর, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত আপনি ছিলেন দেশের এক নম্বর গায়ক। কিন্তু যে সম্মানটা আপনার প্রাপ্য ছিলো, সেটা কি পেয়েছেন?
অবশ্যই। ইন্ডাস্ট্রি আমায় যথেষ্ট সম্মান করে। আমি কী করেছি জানে। অনেক বিষয়েই আমার মতামত চায়। আমার পরিশ্রম কতটা ছিল জানে, দেখে আমি এখনও কী পরিমাণ খাঁটি। আর কেউ যদি সম্মান না-ই দেয়, না দিক। আমার হিট গানগুলো তো আর কেড়ে নিতে পারবে না।
লোকে কিন্তু এখনও আপনার একদিনে ২৮ খানা গান রেকর্ডিং নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে.....
একদিনে ২৮টা গান যারা গাইতে পারে না, তারা হাসে। এতে আমার কিস্যু যায় আসে না। লোকে তো আমার পাঁচখানা ফিল্মফেয়ার এ্যাওয়ার্ড নিয়েও হাসাহাসি করে। তাতে কী এসে গেল? আমি যে পরশ্রী পেয়েছি, তাতেও তো লোকে হাসে। ওসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।
আপনি তো একটা ছবিও প্রযোজনা করছেন ‘ইয়ে সানডে কিউ আতে হ্যাঁয়?’
হ্যাঁ, ৫ ফেব্রুয়ারি রিলিজ করবে। চারটে বুট পালিশওয়ালা বাচ্চার গল্প। যারা অভিনয় করছে, তারা সত্যি, সত্যি গোরেগাঁও স্টেশনে বুট পালিশ করত।
এ তো ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’-এর মতো লাগছে.....
‘ম্লামডগ মিলিওয়ানেয়ার’ তো হাডে পার্সেন্ট আমার ছবি থেকে ইন্সপায়ারড। কেউ জানে না তাই। আমার ছবি তো ২০০৭-এর ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ‘স্লামডগ’ তার পরে শ্যুট করা হয়েছে। ছবিটা বিক্রি করতে পারিনি, কারণ মিঠুনদা ছাড়া আর কোনও স্টার নেই ছবিটায়।
আপনার মতে এখন কে এক নম্বর সঙ্গীত পরিচালক?
কে আবার? এ আর রহমান। ‘স্লামডগ’-এর জন্য অস্কার পেয়েছে বলে বলছি না। ‘স্লামডগ’-এ তো ও কোনও সুরই দেয়নি। ‘রোজা’, ‘বম্বে’ ছবির কম্পোজিশন অনেক ভালো ছিল।
কিন্তু রহমানের সুরে আপনি তো মোটে একটা গানই গেয়েছেন....
ওটাও ওইসব কলিগদের ‘ভালোবাসা’। তারা এমন কিছু বলেছিল রহমানকে যে আমাকে দিয়ে আর গান গাওয়ায়নি।
শেষ প্রশ্ন। কুড়ি বছরের কেরিয়ারে কোনও দুঃখ, খেদ?
(একটু ভেবে) একটাই....পঞ্চমদা যদি আর কিছুদিন বাঁচতেন...বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। সংগীতের জন্য, আর কিছু দিন বাঁচা উচিত ছিল তার। তা হলে আজ যা দূরাবস্থা, তা হতো না।