E-mail this to a friend Printable version
 

এক আদিম অন্ধকারে আমি

fffএক আদিম অন্ধকারে আমি
                                প্রকাশ বিশ্বাস

দ্রুত পা চালালেও যখন দেখলাম এ পথ শেষ হবার নয় ,ওষ্ঠাগত আমার প্রাণ। দু পা যুগপৎ ভারি ,তখন বোবা ক্রোধে প্রায় দৌড়াতে থাকলাম দিগন্তের দিকে। যেখানে চিরহরিৎ বৃক্ষের ছায়ায় সমস্ত নিসর্গে একাকার হয়ে আছে একজন , তার কাছে।

এত অস্থিরতাতেও চোখে পড়ছে বিরাণ ক্ষেতে ফসলের শূন্যতা। কলাই মশুর আর সর্ষের মৃত আগাছা জঞ্জাল ।চাষী রাখাল কেউ নেই।চরাচর গভীর এবং শান্ত। আর চারিদিকে বইছে প্রশান্তির বাতাস। অথচ এই আমি ক্লান্ত, ঘামে জড়জড়।

অহর্নিশ যার প্রতœতত্ত্বকে আমি ধ্র“পদী চিন্তার তারে বাধতে চেয়েছি। দূর্লংঘ্যদূরত্ব ভেঙ্গে দুর্বার ভঙ্গীতে তার সামনে দাঁড়ানোর সাহস আমার হয়নি এতদিন। আর যখন এ অবেলায় সত্তার সমস্ত শক্তি অদম্য ভাষায় কথা বলে উঠলো, টান টান হয়ে স্থির বিন্দুতে পৌঁছলাম আমি। দৃঢ় চিত্তে তাই যাত্রা শুরু করলাম আমি । হায় আমার অন্ধ দুর্দৈব ।

হঠাৎ মরিচীকার মতো সামনে পড়লো বিশাল প্রান্তরে শান্তনার মতো ঝকঝকে বিল। আর এই খানে পেয়ে গেলাম কয়েক জন সহযাত্রী । খেয়া নৌকায় উঠতেই সন্ধ্যার অন্ধকারে দিগন্ত ও আকাশ গুলিয়ে উঠলো যেন। বিলের অতল গভীর কাদার গন্ধে ফাল্গুনের ইষৎ হিম বাতাস হঠাৎদাপিয়ে গেল।বিলের নীচে কালো জল আর উপরের বেগুনি আকাশে পঞ্চমীর আগুনে রংয়ের চাঁদ।

পশ্চিম আকাশে ফুটে রয়েছে সন্ধ্যা তারা।আর এ সব প্রাকৃতিক উপাত্ত সাময়িক উস্কে দিলেও আমাকে আবার তাড়া করলো সেই সন্মোহন।বিল পেরিয়ে ছুটতে ছুটতে প্রান্তরের কিনারায় এসে গ্রাম স্পষ্ট হলো। সহযাত্রীরা অন্য পথ ধরলে আমি হয়ে গেলাম একা ।

ঠাওর করলাম এটি আট দশটা গ্রামের মতো নয়। ডানপাশে শেওলা পড়া সবুজ খাদ ।তার পাড়ে সারিধরে বিদ্যুত থাম দাঁড়িয়ে আছে। বাঁশবন পড়লো সামনে।এবার না ছুটে এগিয়ে যাচ্ছি আমি।আকাশ ঘষতে ঘষতে আধভাঙ্গা চাঁদ চাঁদ উপরে উঠে আসলো ।

তরল অনধকারে দুপাশের বাঁশবন থেকে জুল জুলে চোখ নিয়ে কয়েকটা চতুষ্পেয়ে ছায়া আমার দিকে বার কয়েক দাঁড়িয়েআমার পিছু নিল।কিছুক্ষন পরে দেখি ওগুলো নেই।

আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার হিমে আমি জমে গেলাম।শুনেছি সে গ্রামে যাবতীয় বৃক্ষের আড়ালে অপচ্ছায়ার মতো বীভৎস তষ্করেরা মাঝে মধ্যেই উৎপাতে মেতে ওঠে।আর সন্ধ্যার পর কেউই দরজা খুলে বাইরে আসে না ।

সরু অন্ধকার পথের দুই বাহুতে দুই জলধারা।কুল কুল ধ্বনিতে জল বইছে তাতে।গুম গুম করে ইষাণ কিংবা অন্যদিক হতে অগভীর নলকুপের শব্দ  না অন্য কোন যান্ত্রিক গর্জন ভেসে আসছে।হাঁটতে হাঁটতে কালভার্ট পড়লো।ঠান্ডা শ্যাওলা ছড়ানো রাস্তায় জল ছাপিয়ে উঠছে।

কাদা শ্যাওলায় হাঁটতে হাঁটতে বেতস ঝোপের আড়ালে শিমূল গাছ প্রাগএৗতিহাসিক কোন প্রানীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।আধো জ্যোøা আধো অন্ধকারে মৃদু বাতাসে সাদা তুলো ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষিপ্ত।তার সাথে দেখা হওয়ার স্মৃতিগুলো এই শিমূল তুলোর মতো ডুব সাঁতারে ভেসে আসছে কখনো বা বুদবুদের মতো দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে বাঁশবনের কিনারায় এসে গেলাম। হঠাৎ করে লেবু ফুলের গন্ধ ভেসে আসে কোথা খেকে ।সে গন্ধ আমাকে সঞ্জিবনী এনে দেয়।আমার আবার সাহস ফিরে আসে।আশাবাদী হয়ে উঠি তাকে পাওয়ার জন্য ।আবার জোরে পা চালাতে থাকি।ধূলো মাখা চওড়া পথ স্পষ্ট হতে থাকে।লোকালয়ের দেখা মেলে।বর্গাকৃতির একটি খেলার মাঠের চারপাশের দোকান ঘরগুলোর নি:সঙ্গ সাইনবোর্ড স্বল্পশক্তির বিজলী বাতির সামনে ঝুলে আছে।হঠাৎ আলো ছায়ায় লুকিয়ে থাকা কয়েকটি নেড়ি কুকুর আমাকে দেখে ককিয়ে ওঠে।ডাক চিৎকার শুরু করে দেয়।পরমূহূর্তে এ বাজারের মতো জায়গায়  চৌকিদারের অথবা রাতপ্রহরীর হাঁক শুনি।সে আওয়াজকে নিশানা করে হাঁটতে থাকি।

তাকে খুঁজে পেলে তার কাছ থেকে কাঙ্খিত বাড়িটির ঠিকানা পাওয়া যাবে ভেবে এগিয়ে যাই।কিন্তু তার দিকে যতই এগোই তাকে আর খুঁেজ পাই না ।

এবার আর একটু দূরে তার হাঁক শুনি।এগিয়ে যাই তা লক্ষ্য করে।কিন্তু রাস্তার দুই ধারের প্রাচীন বৃক্ষের ছায়াও বাতাসে পাতার আন্দোলনের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ অথবা সচল কোন দৃশ্য চোখে পড়ছিল না।শুধু আবারো আগের রাতপ্রহরীর গলার আওয়াজ শুনতে পাই।

কিন্তু ভোজভাজির মতো কন্ঠটি মিলিয়ে যায়।ব্যক্তিটির হদিশ খুঁজে না পেয়ে শিউরে উঠি।এসব অনুসঙ্গ তীব্র উৎকন্ঠায় চেপে ধরে আমাকে।কয়েকটি রাত জাগা পেঁচা ডাকতে ডাকতে উড়ে যায় এক অন্ধকার থেকে অন্য অন্ধকারে।  আরো সামনে এগিয়ে গেলে ঝিক করে আমার মস্তিষ্কে বিদ্যুত খেলে যায়।

কঠিন উত্তেজনায় আবিষ্কার করি কাঙ্খিত স্থানে আমি পৌঁছে গেছি। গাছের আড়ালে উঠান,সিঁড়ি, এমনকি একতলা সাদা রংয়ের বাড়িটি আমার সামনে দুলে ওঠে। আমি খুব জোরে পা চালাতে গেলে দুপায়ে আছড়ে পড়ি উঠানে।

উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে ও আতঙ্কে জাগতিক সবটুকু চেতনা প্রায় হারিয়ে যায়।লক্ষ্য করি ঘরের দরজা জানালা সকলই হাট করে খোলা । হুহু করে বাতাস কেলে যাচ্ছে তাতে। কিচ কিচ শব্দে দরজা জানালার কপাট  দোল খাচ্ছে। অসহায় আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলে সবকিছুই ছত্রখান দেখতে পাই।

 বিছানা পত্র ,আলমারির বইপত্র পড়ে আছে এলোমেলো । ভয়ঙ্কর এই শূন্যতায় শরীরে অসম্ভব কাঁপুনি অনুভব করে অর্ধচেতন আমি পাশের বাড়িগুলোর দিকে এগুলাম। ঘরগুলোর সবই বন্ধ।

 দরজায় ক্রমাগত আঘাত করতে থাকলেও ভেতর থেকে কোন সাড়া পেলাম না। আর কেউ জেগে আছেও বলে মনে হলো না। অপ্রাকৃতিক অস্পষ্ট কিছু ধ্বনি ভেসে আসছিল ভেতর থেকে। হঠাৎ বুকের ভেতর তীব্র বেদনা অনুভব করি। লক্ষ্য করি অবয়বহীন এক আদিম অন্ধকারে বসে আছি আমি।




WARNING: Any unauthorised use or reproduction of redtimesbd.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.

 
 
 
Bookmark with:  
    GoogleFacebook  GoogleGoogle    
 
More News
 
Related News
No more Related News Found
 
 
 
 
কৃষি ও কৃষকের গল্প
বিনোদন উপাখ্যান
 
 
The REDTIMESBD is not responsible for the content of external internet sites.
 
News Sources Contact Us
About redtimesbd.com Terms of Use  
Advertise With Us Privacy & Cookies  
Sitemap Developed By Mamunur Hossen